মেনু নির্বাচন করুন

শাহ মোহছেন আউলিয়া

চট্টগ্রামের অস্তিত্ব বিশ্ব মানচিত্রে অনেক সু-প্রাচীন কালের। চট্টগ্রামের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পাহাড় নদী ও সমুদ্রের সহাবস্থান, সমুদ্রপথে সম্পদ সংগ্রহ ও আদান প্রদান সহজতর হবার কারণে বাংলার বাণিজ্য বন্দর হিসেবে চট্টগ্রামের খ্যাতি অনেক প্রাচীনকালের। সামুদ্রিক বন্দর হবার কারণে প্রায় ২০০০ বৎসর পূর্ব থেকে চট্টগ্রামে বিদেশি বণিকদের যাতায়াত ছিল। মাসুদী, ইদ্রিসী, ইবনে খুব দাদবা, স্পিনি, টলেমি প্রমুখ ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকদের বিবরণী, ১৩৫০ সালের চীনা পর্যটক ওয়াংতা ইউয়ান এর সাক্ষ্য ও ভূ পর্যটক ইবনে বতুতার বর্ণনা থেকে জানা যায় আরবীয় বণিকগণ প্রথমে চট্টগ্রামের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন। ৮ম ও ৯ম শতক থেকে বাণিজ্য উপলক্ষে আরব বণিকগণ এবং ইসলাম প্রচারের জন্য পীর আউলিয়াগণ সমুদ্র পথে বাংলাদেশে তথা চট্টগ্রামে আগমন করেন। বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর চিশতিয়া সোহরাওয়ার্দীয়া, মাদারিয়া, নকসবন্দীয়া, কলন্দরীয়া ইত্যাদি তরিকার সুফীগণের বাংলায় আগমন অব্যাহত থাকে।

১৩৪০ খৃষ্টাব্দে সোনার গাঁয়ের স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ্‌ চট্টগ্রাম বিজয় করলে চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়ে গৌড়ীয় ও পশ্চিম মধ্য এশিয়ার দেশ সমূহ হতে অনেক ভাগ্যান্বেষী মুসলমান চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন শুরু করেন। সপ্তদশ শতকের ঐতিহাসিক শিহাব উদ্দিন তালিশ ও কবি মোহাম্মদ খান এর দেয়া তথ্য মতে কদল খান গাজী (রহঃ) ও বদর শাহ (রহঃ) প্রমুখ বার আউলিয়াগণ চট্টগ্রাম বিজয়ে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহকে সাহায্য করেছিলেন। কদলখান গাজী চট্টগ্রামে কত্তাল শাহ নামে পরিচিত এবং বর্তমান কাতালগঞ্জ তার স্মৃতি বহন করে।

হযরত বদর শাহ (রহঃ) ও কত্তাল শাহ (রহঃ) এর চট্টগ্রাম আগমনের অন্যতম সফর সঙ্গী ছিলেন বার আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ্‌ মোহছেন আউলিয়া (রহঃ)। তিনি আরবীয় শেখ এবং জনশ্রুতিতে বদর শাহ (রহঃ) এর ভাগিনা ছিলেন। বার আউলিয়াগণ সমুদ্র পথে চট্টগ্রাম আগমন করেন। বদর শাহ (রহঃ) ও মোহছেন আউলিয়া (রহঃ) সম্পর্কে যত কিংবদনত্মী আছে সবই সমুদ্র সম্পর্কিত। কবি মোহাম্মদ খান এর পূর্ব পুরুষ মাহি আছোয়ার, ঐতিহাসিক হামিদুল্লাহ খান বর্ণিত তথ্য যেমন ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের চট্টগ্রাম বিজয়ে ইরাকী বণিক আলফা হোসাইনী কর্তৃক ফখরুদ্দীন মোবারক শাহকে সাহায্য প্রদান ইত্যাদি থেকে মনে হয় বার আউলিয়াগণ তথা মোহছেন আউলিয়া (রহঃ) সমুদ্র পথে চট্টগ্রাম আগমন করেন। ঐতিহাসিক সিহাব উদ্দিন তালিশের অগ্রবর্তী একজন বাঙালি কবি মোহাম্মদ খান ১৫৮০-১৬৫০ মকতুল হোসেন গ্রন্থে চট্টগ্রাম বিজয়ের বর্ণনা দেন। মোহাম্মদ খান মুসলমানদের চট্টগ্রাম বিজয়ের ইতিহাস লিখেননি বরং নিজের বংশ পরিচয় দিতে গিয়ে অলক্ষ্যে

মুসলমানদের চট্টগ্রাম বিজয় ও চট্টগ্রামে ইসলামের প্রচার কাহিনী বর্ণনা করেন। কবির মতে তাঁর মাতৃকুলের পূর্ব পুরুষ শয়খ শরীফ উদ্দিন কদল খান গাজীর অন্যতম প্রেমের শখা ছিলেন অর্থাৎ বার আউলিয়ার অন্যতম ছিলেন। কবির মতে কদল খান গাজী ও তার একাদশ মিত্র সঙ্গে নিয়ে শত্রুদের পরাজিত করে চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচার করেন। কবি তাঁর পিতৃকুল পরিচয়ে বলেন তার পূর্ব পুরুষ মাহি আছোয়ার আরব দেশ থেকে চট্টগ্রামে আসেন। চট্টগ্রাম আসলে চট্টগ্রামের অভিভাবক পীর বদর শাহ বা বদরে আলম তাকে সাদরে গ্রহণ করেন।

চট্টগ্রামের কবি মুকিম তাঁর গোলে বকাউলী কাব্যে তাঁর পূর্ববর্তী কবি মুজাম্মিলের নাম উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য যে ১৪৪০ সালের পূর্বে কবি জীবিত ছিলেন। এবং তিনি চট্টগ্রামের বদরপাতিতে অবস্থানকারী বদর পীরের মুরিদ ছিলেন। “শাহ বদর উদ্দিন পীর কৃপাকুল হরি শতমুখে সে বাখান কহিতে না পারি তাহান আদেশে মাল্য শিরিতে ধরিয়া রচিলেন্ত মোজাম্মিল্লে মন আকলিয়া”। চট্টগ্রামে প্রাপ্ত আরবি ভাষায় লিখিত পীর ও সুফী সম্পর্কিত বিভিন্ন পান্ডুলিপিতে শাহ বদরে আলমের সাথে শাহ মোহছেনদের নাম উল্লেখ রয়েছে।

কথিত আছে যে বদর শাহ (রহঃ) সফর সঙ্গী শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহঃ) ও কাতালপীর কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে বর্তমান আনোয়ারা থানার গহিরা গ্রামের পশ্চিমে সমুদ্র উপকূলবর্তী ইছাখালী গ্রামের কডির হাটে খানকাহ তৈরি করে ধর্ম প্রচারে লিপ্ত হন। কালের বিবর্তনে কডির হাট সমুদ্র গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পরবর্তীতে কাতালপুরী চট্টগ্রামের কাতালগঞ্জে চলে যান এবং মোহছেন আউলিয়া (রহঃ) শঙ্খ নদীর উপকূলে ঝিউরি গ্রামে অবস্থান করতে থাকেন। মোহছেন আউলিয়ার ঝিউরি গ্রামের খানকা ও মসজিদে প্রাপ্ত সুলতানী আমলের শিলালিপি ও মোগল আমলে দেয় মদদ-ই-মা-মাশ হিসেবে প্রাপ্ত জমি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত করে চতুর্দশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের অভিভাবক পীর বদর শাহ (রহঃ) এর অন্যতম ভ্রমণ সহকারী শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহঃ) চট্টগ্রামে এবং পরবর্তীতে দেয়াং এলাকায় ইসলাম প্রচার করেন। বর্তমানে আনোয়ারা থানার বড়উঠান, ঝিউরী, বটতলীসহ কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরের এক বিস্তীর্ণ এলাকা দেয়াং নামে পরিচিত ছিল। বদর শাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মোহছেন আউলিয়া দেয়াং এলাকার ঝিউরী গ্রামে তাঁর খানকা নির্মাণ করে ইসলাম প্রচারে ব্রতী হন। তাঁর ভক্তদের আগ্রহে সেখানে খানকা নির্মিত হয়ে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় লিপ্ত হন। অগণিত ভক্ত তার খানকায় ভিড় জমাতে শুরু করে। মোহছেন আউলিয়াকে কেন্দ্র করে ঝিউরি গ্রাম সহ আনোয়ারার পার্শ্ববর্তী পটিয়া ও দক্ষিণে শঙ্খ নদী পর্যনত্ম ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে ও মুসলিম জনবসতি গড়ে উঠে। জনশ্রুতি রয়েছে শাহ মোহছেন আউলিয়ার খোঁজে পরবর্তীতে তাঁর কন্যা নির্ঘন বিবি, ভাইপো ও জামাতা সিকান্দরও আনোয়ারায় এসে শাহ সাহেবের সাথে একত্রিত হন। শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) ইন্তেকালের পর তাঁর মরদেহ ঝিউরী গ্রামে দাফন করা হয়। তাঁর কন্যা ও জামাতার কবরও তৎসংলগ্ন জায়গায় অবস্থিত ছিল।

মোহছেন আউলিয়া (রহ.) ওফাতের পর তাঁর মাজারে আগত লোকদের নামায এবং এবাদতের সুযোগের জন্য হোসেন শাহী শাসন আমলে বাংলার সুলতান নসরত শাহের পুত্র আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ১৬৬৬ খৃ: চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় বছর। এই বছরের প্রথম দিকে সুবেদার শায়েস্তা খানের সুযোগ্য পুত্র বুজর্গ উমেদ খান মগ ও ফিরিঙ্গি জলদস্যুদেরকে বিতাড়িত করে চট্টগ্রামকে মোগল শাসনভুক্ত করেন। সুলতানি শাসকদের মত বাংলার মোগল শাসনে সুফি সাধকগণ সমাদৃত হন এবং রাষ্ট্র কর্তৃক মদদ-ই-মা-আশ হিসাবে জমি পান। বুজর্গ উমেদ খাঁন ঝিউরী গ্রামের শাহ মোহছেন আউলিয়ার মাজার, মসজিদ এবং তাঁর ফরজন্দ সম্পর্কিত ব্যাপারে নবাবের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলে এক সনদ দ্বারা ১৬৬৬ খৃ: ১০ দ্রোন লাখেরাজ ভূমি মোহছেন আউলিয়ার তিনজন ফরজন্দ বা বংশধরগণকে মাজার ও মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রদান করা হয়। উক্ত সনদে ঝিউরী গ্রামে মাজার ও মসজিদের স্থানের উল্লেখ রয়েছে এবং শাহ সাহেবের নাম শাহ মছনদ এবং উপাধি জাহান জাহান খান লিপিবদ্ধ রয়েছে।

পরবর্তীতে ১৮০০ সালের প্রারম্ভে মোহছেন আউলিয়ার মাজার ও মসজিদ শঙ্খ নদীর ভাঙনের কবলে পড়লে আউলিয়া সাহেব ও তাঁর কন্যা ও জামাতার কফিন তৎকালিন দেয়াং পাহাড়ের পশ্চিম দিকে বটতলীতে পুনঃ দাফন করা হয়। বর্তমানে বা অনেক পূর্বেও ঝিউরী গ্রামের নিকট কোন নদী পরিলক্ষিত হয় না। আধুনিক মানচিত্রের সাহায্যে ঝিউরীর মধ্যে নদীর অবস্থান নির্ণয় সম্ভব নয়। সমসাময়িক পুরানো তথ্য ও উৎসের সন্ধানে দেখা যায় ঝিউরীর পাশ দিয়ে শঙ্খ (৭ম পৃঃ দ্রঃ)
একটি ধারা যাকে ভরা শঙ্খ বলা হয়, তা প্রবাহিত ছিল। বর্তমানে সেই নদীর অস্থিত্ব নেই। নদীর ভাঙনে মাজার ভেঙে যাবার উপক্রম হলে, তিনি বেড়াদের (পাল্কি বহনকারী) স্বপ্ন দেখান সেখান থেকে তাঁর মৃতদেহ সরিয়ে যেন বটতলী গ্রামে পুনঃ দাফন করা হয়। বেড়া পরিবার বা পালকি বাহকদের সাথে মোহছেন আউলিয়া (রহ.) একটি সু-সম্পর্ক ছিল তার একটি প্রমাণ এই যে, বেড়ারাই এখনও পর্যন্ত তার মাজারের খড়ের চাল বিশেষ এক নিয়ম পালনের মধ্যে দিয়ে প্রতি বছর বদলিয়ে থাকেন। আধ্যাত্মিক আউলিয়ার মাজার পাকা ঘর হলেও উপরের অংশটুকু ছনের ছাউনি। ছাউনি বদলানোর সময় কর্মরত লোকদের শরীরে যতবার ঘাম বেরুবে ততবার কাজ বন্ধ রেখে তাদের গোসল করে আবার কাজ শুরু করতে হয়। অন্য এক জনশ্রুতি মতে বেলচুড়ার জমিদার জবরদস্ত খান এবং পরবর্তীতে রহমত খান এবং হোসেন খান স্বপ্নে আদেশপ্রাপ্ত হয়ে মাজারকে নদীর ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করেন। অন্য কিংবদন্তি মতে ঝিউরী গ্রামে শঙ্খ নদীর ভাঙন দেখে এবং শাহ সাহেবের কফিন নদীর স্রোতে ভেসে যেতে দেখে স্থানীয় জনগণ সেই কফিনকে বটতলীতে পুনঃদাফন করেন। এইভাবে শাহ সাহেবের কন্যা নির্ঘন এবং জামাতা সেকান্দরের কফিনকেও বটতলীতে সমাহিত করা হয়। সুলতানি যুগে নির্মিত তাঁর মাজারের পার্শ্বের শাহী মসজিদটি নদীর ভাঙনে ভেঙে গেলে মসজিদে রক্ষিত শিলালিপিটি বটতলীতে মোহছেন আউলিয়ার মাজারে সংরক্ষিত করা হয়। এখনও তা সেখানে রয়েছে। শিলালিপিটি থেকে ভক্তরা ধুয়ে ধুয়ে পানি খেতে খেতে বর্তমানে অক্ষরগুলো পাঠ করা সম্ভব নয়। ড. এনামুল হক আজ থেকে ১০০ বৎসর পূর্বে শিলালিপির আংশিক পাঠ করে হিজরি ৮০০ সাল বলে অভিমত দেন। ঐতিহাসিক ড. আব্দুল করিমের মতে মোহছেন আউলিয়ার ওফাতের পর হোসেন শাহী আমলে বাংলার শাসক নসরত শাহের পুত্র আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহের সময়ে এই শিলালিপি উৎকীর্ণ হয়। ড. করিম সাহেব নিজেই শিলালিপিটি গভীরভাবে পরীক্ষা করেন।

মোগল শাসনে বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খানের আমলে ১৬৬৬ খৃ: শাহ মোহছেন আউলিয়ার ফরজন্দকে যে লাখেরাজ বা মদদ-ই-মা আশ ভূমি দান করা হয় সেই দান পত্রে বা দলিলে শেখ মনছুর, শেখ কুতুব ও শেখ ইব্রাহিমের নাম উল্লেখ রয়েছে। অনেকে মনে করেন এই ওয়ারিশগণ মোহছেন আউলিয়ার কন্যা নির্ঘন বিবির ছেলে। নির্ঘন ও জামাতা সেকান্দর চতুর্দশ শতকের লোক। তাদের ছেলে ২৫০ বছর থেকে ৩০০ বৎসর বেঁচে থাকতে পারেন না হয়ত” তারা মোহছেন আউলিয়ার অধঃস্থন পুরুষ হতে পারে। দান পত্রের দলিল থেকে সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত যে, শাহ সাহেবের মাজার মোগল আমলের শেষ পাদ পর্যন্ত ঝিউরীতে অবস্থিত ছিল।
পলাশীর যুদ্ধের পর মীর কাশিম হতে ১৭৬১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামের শাসন ভার গ্রহণ করেন। বৃটিশ শাসকগণ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) ফরজন্দকে দেয়া ভূমি সনদ থাকবার কারণে বাজেয়াপ্ত করেননি। ১৮৪৪ সালে বৃটিশ তদন্তকারী অফিসার শ্রী শর্মা কর্তৃক তৈরি রেকর্ডে মোহছেন আউলিয়ার নাম মছনদ ও ‘মোছন’ রয়েছে এবং তার মাজার বটতলীতে যেখানে পাকা দেয়াল রয়েছে বলে উল্লেখ আছে। তাহলে দেখা যায় শাহ সাহেবের মাজার ১৮৪৪ খৃ: পূর্বেও বটতলীতে ছিল এখনও রয়েছে। কিংবদন্তি রয়েছে বার আউলিয়ার অন্যতম বদর শাহ (রহ.) আলোকিত চাটি (মাটির চেরাগ) জ্বালিয়ে জ্বিন পরীদের তাড়িয়ে চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচার করেন। চেরাগ ইসলাম ধর্মে আলোর প্রতীক। অন্যায় ও অন্ধকারকে দূরীভূত করে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠা। অনুরূপ শাহ সাহেবের মাজারে যে সারাক্ষণ চেরাগ বা বাতি জ্বালানো হয় তা মনে হয় আলোর প্রতীক।

যে সকল সূফী আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা বা কামালিয়াত সাধন করে তারাই ওলী। ওলী একজন অর্থাৎ একজন ওলী। আউলিয়া বহুবচন অর্থাৎ একাধিক ওলী। আউলিয়া বলতে একাধিক ওলীর নেতাকে বোঝানো হয়। হযরত মোহছেন আউলিয়া (রহ.) একাধিক ওলীকে নিয়ে বার আউলিয়া থেকে পৃথক হয়ে ধর্ম প্রচারে ব্রতী হয়েছেন বলে জনগণ তাকে মোহছেন আউলিয়া রূপে আখ্যায়িত করেন।

আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মোহছেন আউলিয়ার বংশধর সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, হযরতের কোন পুত্র সন্তান ছিল না। তিনি আরবীয় শেখ ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর বংশধরেরা খোন্দকার বংশে পরিণত হয়েছিল। শাহ সাহেবের বংশধরগণ মোটামুটি সচ্ছল ছিলেন। রাষ্ট্র প্রদত্ত দশ দ্রোন লাখেরাজ ভূমি তাঁদের হাতে নেই। সূফীরা যে তাদের জীবদ্দশায় সমাজকে প্রভাবিত করেছিল তা নয় বরং মৃত্যুর পরও তাদের মাজার ও দরগাহ সমূহ সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এখনও করছে। তাদের দরগাহ সমূহ তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে এবং সমাজের বিকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। জাতীয় জীবনে সূফীদের ভূমিকা অম্লান।

চট্টগ্রামের প্রতিটি মাজারকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু লোকবিশ্বাস রয়েছে। যে মাজার যত বেশি প্রাচীন, সেগুলো সম্পর্কে লোককথাও বেশ বিস্তৃত। লোককথা ইতিহাসের ভিত্তি হতে পারে না। কারণ ইতিহাস ধারণার ওপর নয় বরং সঠিক ঘটনার ওপরে নির্ভর করে। তবে এটা সত্য যে, লোককথার সূত্র ধরে অনেক সময় সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়। শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) ছিলেন প্রথম অলৌকিক কারামত সম্পন্ন বুজুর্গান আউলিয়া। ওলী দরবেশগণ আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা অর্জন করে অলৌকিক বা অতি লৌকিক কেরামতি কাজের দ্বারা দুস্থ লোকদের সাহায্য করে থাকেন। হযরত মোহছেন আউলিয়া (রহ.) কেরামত ও রুহানী শক্তি কখনো স্বেচ্ছায় প্রকাশ করেননি বরং বিভিন্ন প্রয়োজন ও পরিবেশ অনুযায়ী এই জাতীয় কর্ম মানুষের সামনে উপস্থাপন করে বিপদগামী জনগণকে হেদায়েত করেছিলেন। তাঁর বিভিন্ন কারামত তাঁর শান ও মান সম্পর্কে সুস্পষ্ট সাক্ষ্য প্রদান করে। অমুসলিম বেডা পরিবারের (পাল্কি বাহক) বোবা ছেলে ও তাঁর দোয়ায় বাকশক্তি ফিরে পেয়েছিল। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর দুর্গত অসহায় লোক মোহছেন আউলিয়া (রহ.)র কৃপা লাভে ধন্য হয়েছেন। তাঁর ঝিউরি গ্রামে অবস্থানকালে শঙ্খ নদী উপকূলে গড়ে ওঠেছিল এক আধ্যাত্মিক সাধনালয়। তাঁর মানবপ্রেম ও বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে দলে দলে লোক তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ ও ইসলামের ছায়াতলে সমবেত হতে থাকেন। মোহছেন আউলিয়া (রা.) মছনদ আউলিয়া (রহ.) ঝিউরি গ্রামেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সেখানে নির্মিত হয় তাঁর প্রথম মাজার। শিক্ষিত সচেতন জনগণ তাঁকে শ্রদ্ধা করে মোহছেন আউলিয়া (রহ.) বলেন। দেশের জনগণ সাধারণত তাকে ‘মোছন’ আউলিয়া বলেন। প্রাচীন লেখকগণ তাকে হযরত শাহ মোছন আউলিয়া বলেন। বর্তমানে অনেকে তাকে মোহছেন বা মুহসিন আউলিয়া বলে থাকেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত নাম শাহ্‌ মছনদ যাহা সুলতানি ও মোঘল আমলের শিলালিপি এবং চট্টগ্রামে প্রাপ্ত সূফী ও পীরদের তালিকার প্রাচীন আরবি পাণ্ডুলিপিও লাখেরাজ সম্পত্তি তদন্ত বিষয়ক কোর্ট প্রসিডিং এ প্রমাণিত।

বর্তমানে আনোয়ারা থানার বটতলিতে তাঁর মাজার শরীফ সংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠেছে বড় বাজার, কলেজ, স্কুল, মাদ্রাসা ও আবাসিক ভবন যা গৌরবোজ্জ্বল অতীত সূফী আউলিয়াদের কর্মকাণ্ডের সাক্ষ্য দিচ্ছে। প্রতি বছর ৬ আষাঢ় তাঁর মাজার তথা সমগ্র বটতলী এলাকায় কয়েক বর্গমাইল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় বার্ষিক ওরশ। দেশ বিদেশ দূর দূরানত্ম থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত আশেকানের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে বটতলী সহ আশেপাশের এলাকা। আশেকান তাঁর মাজারে গিয়ে নিজের মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করে থাকেন। মহান আল্লাহ তাঁর আত্মাকে পরিতৃপ্ত করুন।


Share with :
Facebook Twitter